কলকাতা ও সংলগ্ন উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় জাল নথি তৈরি ও সরবরাহ চক্রের হদিশ ঘিরে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় একটি সংগঠিত চক্র ভুয়ো পরিচয়পত্র ও সরকারি নথি তৈরি করে কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন চালিয়ে আসছিল। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে রাজ্য পুলিশের পক্ষ থেকে একটি Special Investigation Team (SIT) গঠন করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এই চক্র মূলত ভুয়ো আধার কার্ড, ভোটার আইডি, জন্ম শংসাপত্র, বাসিন্দা সার্টিফিকেট এবং বিভিন্ন পরিচয় সংক্রান্ত নথি তৈরি করত। অভিযোগ, এই নথিগুলি ব্যবহার করে সরকারি সুবিধা গ্রহণ, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা, সিম কার্ড সংগ্রহ এবং অন্যান্য প্রশাসনিক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছিল।
প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, এই চক্রের কার্যকলাপ শুধু কলকাতা শহরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। উত্তর ২৪ পরগনার একাধিক এলাকা ছাড়াও রাজ্যের বাইরে যোগাযোগ থাকার ইঙ্গিত মিলেছে। তদন্তকারীদের দাবি, স্থানীয় স্তরের এজেন্টদের মাধ্যমে গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে এই চক্র নিয়মিত কাজ চালাত।
পুলিশ সূত্রে আরও জানা গেছে, জাল নথি তৈরির জন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো। নথির ধরন ও জরুরিতার ওপর নির্ভর করে অর্থের পরিমাণ বাড়ানো হতো বলে অভিযোগ। SIT-এর প্রাথমিক অনুমান, গত কয়েক বছরে এই চক্রের মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকার অবৈধ আর্থিক লেনদেন হয়েছে।
ঘটনার পর কলকাতার বউবাজার, শিয়ালদহ এবং উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রাম ও বারাসত এলাকায় একযোগে অভিযান চালানো হয়। সেই অভিযানে একাধিক ল্যাপটপ, হাই-রেজোলিউশন প্রিন্টার, হার্ডডিস্ক, সরকারি সিল ও স্ট্যাম্প উদ্ধার করেছে পুলিশ। পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল ডেটা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
SIT সূত্রে খবর, উদ্ধার হওয়া ডিজিটাল ডেটা খতিয়ে দেখে চক্রের মূল মাথা এবং আর্থিক লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। তদন্তকারীরা ইতিমধ্যেই একাধিক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ও ডিজিটাল ট্রানজ্যাকশনের নথি যাচাই শুরু করেছেন। মোবাইল কল ডিটেইল রেকর্ড এবং অনলাইন যোগাযোগের তথ্যও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।
এক পুলিশ আধিকারিক জানান, এই চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় থাকলেও এতদিন নজরের বাইরে ছিল। তাঁর কথায়,
“এই ধরনের জাল নথি চক্র শুধুমাত্র আর্থিক অপরাধ নয়, প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।”
এই ঘটনার পর সরকারি নথি যাচাই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় স্তরে যাচাই প্রক্রিয়া দুর্বল হলে এই ধরনের চক্র সহজেই সুযোগ নেয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভবিষ্যতে নথি যাচাই প্রক্রিয়া আরও কড়া করা হবে এবং ডিজিটাল ডেটাবেসের সঙ্গে স্থানীয় তথ্যের মিল আরও শক্তভাবে পরীক্ষা করা হবে।
SIT গঠনের পর তদন্তের গতি আরও বেড়েছে বলে দাবি পুলিশের। ইতিমধ্যেই কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। যদিও তদন্তের স্বার্থে পুলিশ গ্রেপ্তার সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি। তবে উপযুক্ত প্রমাণের ভিত্তিতে শীঘ্রই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের মতে, এই ধরনের জাল নথি চক্র শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়, বরং সামাজিক ও প্রশাসনিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও বড় হুমকি। অনেকেই দ্রুত তদন্ত শেষ করে দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবি তুলেছেন।
প্রশাসনের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, এই ঘটনার পর সব জেলা প্রশাসনকে নথি যাচাই সংক্রান্ত প্রক্রিয়া পুনরায় খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সন্দেহজনক নথি বা এজেন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বর্তমানে SIT তদন্তের পরবর্তী ধাপে চক্রের আর্থিক নেটওয়ার্ক, ভিনরাজ্য যোগাযোগ এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের শনাক্ত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। তদন্তে নতুন তথ্য উঠে আসার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট আধিকারিকরা।
এই ঘটনার দিকে নজর রাখছে রাজ্যের প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। জাল নথি চক্রের বিরুদ্ধে তদন্ত শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে সবাই।