হোম / সাইবার অপরাধ / ডিজিটাল মায়াজালে পশ্চিমবঙ্গ: সাইবার অপরাধের ক্রমবর্ধমান গ্রাফ ও নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ

ডিজিটাল মায়াজালে পশ্চিমবঙ্গ: সাইবার অপরাধের ক্রমবর্ধমান গ্রাফ ও নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ

২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গের সাইবার অপরাধ এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। কেবল গত বছরেই কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে কয়েকশ কোটি টাকার জালিয়াতি হয়েছে। ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ থেকে শুরু করে ‘এআই ডিপফেক’—প্রতারণার নতুন নতুন ফাঁদে বিপর্যস্ত সাধারণ মানুষ। বারাসাত থেকে বর্ধমান, রাজ্যের সাইবার মানচিত্রের খুঁটিনাটি নিয়ে আমাদের এই বিশেষ প্রতিবেদন।

একবিংশ শতাব্দীর এই তৃতীয় দশকে দাঁড়িয়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে ইন্টারনেট। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠের মতো এই ডিজিটাল নির্ভরতাই ডেকে আনছে চরম বিপদ। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে দাঁড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গ তথা গোটা ভারতে সাইবার অপরাধ একটি ভয়াবহ সংকটে রূপ নিয়েছে। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো (NCRB) এবং পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, অপরাধীরা এখন আর কেবল সাধারণ ওটিপি (OTP) জালিয়াতিতে সীমাবদ্ধ নেই; তারা ব্যবহার করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং মনস্তাত্ত্বিক চাপের মতো জটিল কৌশল।

১. জেলা ভিত্তিক চিত্র: আর্থিক ক্ষতির পাহাড়

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে কেবল কলকাতা শহরই সাইবার প্রতারকদের হাতে হারিয়েছে প্রায় ২১০ কোটি টাকা। যদিও পুলিশ এর মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ টাকা উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় অনেকটা বেশি। কিন্তু পরিস্থিতি জেলার ক্ষেত্রে আরও উদ্বেগজনক।

উত্তর ২৪ পরগনা ও বারাসাত:

বারাসাত পুলিশ জেলার প্রকাশিত বার্ষিক খতিয়ান অনুযায়ী, গত এক বছরে এই এলাকায় প্রায় ২০ কোটি টাকার সাইবার জালিয়াতি হয়েছে। এর মধ্যে পুলিশ মাত্র ২৬ শতাংশ বা প্রায় ৫.২ কোটি টাকা উদ্ধার করে প্রকৃত মালিকদের হাতে তুলে দিতে পেরেছে। বারাসাতের সমীর কুমার বা ডক্টর মণীন্দ্রনাথ পালের মতো অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিও এই জালিয়াতির শিকার হয়েছেন, যারা লক্ষ লক্ষ টাকা খুইয়েছিলেন।

পূর্ব বর্ধমান ও সীমান্ত এলাকা:

পূর্ব বর্ধমান জেলায় ইদানীং ভুয়ো সিম কার্ড এবং ‘মিউল অ্যাকাউন্ট’ (Mule Account) ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। ঝাড়খণ্ডের জামতারা সংলগ্ন বীরভূম ও পশ্চিম বর্ধমানের সীমান্ত এলাকাগুলো এখন অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি বীরভূমের খয়রাশোল থেকে একটি বড় চক্রকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের কাছ থেকে ৮৪টি মোবাইল ফোন এবং শতাধিক ডেবিট কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে।

২. নতুন আতঙ্কের নাম: ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’

২০২৫-২৬ সালের সবচেয়ে আলোচিত এবং ভয়ংকর অপরাধ হলো ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’। এক্ষেত্রে প্রতারকরা সিবিআই (CBI), নার্কোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরো বা মুম্বই পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ছদ্মবেশে স্কাইপ বা হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিও কল করে। তারা ভিকটিমকে জানায় যে তার আধার কার্ড বা পার্সেল কোনো অবৈধ ড্রাগ পাচারে ব্যবহৃত হয়েছে।

সম্প্রতি সল্টলেকের এক ৭৭ বছর বয়সী বৃদ্ধা এই পদ্ধতিতে ১.২ কোটি টাকা হারিয়েছেন। তাকে টানা চার দিন ভিডিও কলে ‘ডিজিটাল নজরবন্দি’ করে রাখা হয়েছিল এবং ভয় দেখিয়ে তার সমস্ত জমানো মিউচুয়াল ফান্ড ও সঞ্চয় ভাঙিয়ে নেওয়া হয়। একইভাবে কল্যাণীর এক বৃদ্ধকে সাত দিন বন্দি রেখে ১ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ সম্প্রতি ৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সাইবার অপরাধে অন্যতম কঠোর সাজা।

৩. জালিয়াতির সেকাল ও একাল

অপরাধের ধরনে আমূল পরিবর্তন এসেছে। নিচের সারণীটি দেখলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে:

অপরাধের ধরনবর্তমান কৌশল (২০২৬)মূল লক্ষ্য
ফিশিংএআই জেনারেটেড ভুয়ো ইমেল ও লিঙ্কব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা
ডিজিটাল অ্যারেস্টভিডিও কলে আইনি ভয় দেখানোজীবনভর সঞ্চয় আত্মসাৎ
ডিপফেকপরিচিত মানুষের কণ্ঠস্বর বা চেহারা নকল করাতৎক্ষণাৎ টাকা দাবি করা
ট্রেডিং জালিয়াতিভুয়ো বিনিয়োগ অ্যাপ ও হোয়্যাটসঅ্যাপ গ্রুপবড় অঙ্কের মুনাফার টোপ

৪. আন্তঃদেশীয় নেটওয়ার্ক ও সাইবার দাসত্ব

তদন্তে উঠে এসেছে যে পশ্চিমবঙ্গের বহু শিক্ষিত যুবককে মায়ানমার, কম্বোডিয়া বা থাইল্যান্ডে পাচার করে দেওয়া হচ্ছে। তাদের উচ্চ বেতনের কাজের প্রলোভন দিয়ে সেখানে নিয়ে গিয়ে ‘সাইবার স্ক্যাম সেন্টারে’ কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের সাইবার উইং সম্প্রতি এমন বেশ কিছু যুবককে উদ্ধার করেছে, যারা মূলত ‘সাইবার দাসত্ব’ (Cyber Slavery) এর শিকার হয়েছিল।

৫. প্রতিরোধের লড়াই ও আইনি তৎপরতা

পরিস্থিতি সামাল দিতে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ এবং কলকাতা পুলিশ ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমানে রাজ্যে:

  • প্রতিটি পুলিশ জেলায় ডেডিকেটেড সাইবার ক্রাইম থানা রয়েছে।
  • ১৯৩০ হেল্পলাইন: আর্থিক জালিয়াতির ১-২ ঘণ্টার মধ্যে এই নম্বরে কল করলে টাকা ফ্রিজ করার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।
  • লালবাজারের তৎপরতা: কলকাতা পুলিশ এখন জালিয়াতির টাকা উদ্ধারের জন্য বিশেষ সফটওয়্যার এবং আলাদা রিকভারি ইউনিট ব্যবহার করছে।

৬. বিশেষজ্ঞের পরামর্শ: কীভাবে নিরাপদ থাকবেন?

সাইবার বিশেষজ্ঞ ও পুলিশের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষের জন্য কিছু জরুরি নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছে:

  1. ভয় পাবেন না: পুলিশ বা কোনো সরকারি সংস্থা কখনও ভিডিও কলে কাউকে ‘অ্যারেস্ট’ করে না বা টাকা দাবি করে না।
  2. তথ্য গোপন রাখুন: আধার কার্ডের নম্বর, ওটিপি বা ব্যাঙ্কের পিন কখনও কাউকে দেবেন না।
  3. অপরিচিত লিঙ্ক: হোয়াটসঅ্যাপ বা এসএমএস-এ আসা বিদ্যুৎ বিল বা কুরিয়ার সংক্রান্ত সন্দেহজনক লিঙ্কে ক্লিক করবেন না।
  4. দ্রুত অভিযোগ: প্রতারিত হলে দেরি না করে ১৯৩০ নম্বরে কল করুন অথবা www.cybercrime.gov.in পোর্টালে তথ্য দিন।

উপসংহার:

প্রযুক্তি যেমন আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, তেমনি অসতর্কতায় এটি ডেকে আনতে পারে চরম বিপদ। অপরাধীরা নিত্যনতুন ফাঁদ পাতছে, তাই আমাদের একমাত্র হাতিয়ার হলো সচেতনতা। ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে “আগে যাচাই, পরে বিশ্বাস” নীতি মেনে চললে এই মায়াজাল থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *