হোম / দেশ / রক্তের স্রোতে বৈশালি: বিহারে জমি বিবাদ ও এক পরিবারের মর্মান্তিক পরিণতি

রক্তের স্রোতে বৈশালি: বিহারে জমি বিবাদ ও এক পরিবারের মর্মান্তিক পরিণতি

বিহারের বৈশালি জেলায় জমি বিবাদকে কেন্দ্র করে ঘটে গেল এক পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড। একটি পরিবারের পাঁচ সদস্যকে রাতের অন্ধকারে পিটিয়ে ও কুপিয়ে খুনের ঘটনায় কেঁপে উঠেছে গোটা দেশ। এই মর্মান্তিক অপরাধ কেবল একটি পরিবারের বিনাশ নয়, বরং বিহারের গ্রামীন রাজনীতি ও বিচার ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা ক্ষতের বহিঃপ্রকাশ। ২০২৬ সালের এই বিশেষ প্রতিবেদনে দেখুন অপরাধের কারণ ও প্রশাসনের ভূমিকা।

নতুন বছরের প্রারম্ভেই বিহারের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে স্বজন হারানোর আর্তনাদে। রাজধানী পাটনা থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে বৈশালি জেলার এক নিভৃত গ্রামে ঘটে গেছে এমন এক হত্যাকাণ্ড, যা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়। একটি সামান্য জমির টুকরোকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের বিবাদ যে শেষ পর্যন্ত একই পরিবারের পাঁচ সদস্যের রক্ত ঝরাবে, তা কল্পনাও করতে পারেননি গ্রামবাসীরা। এই ঘটনা বিহারের সুশাসন (Sushasan) এবং পুলিশের কর্মদক্ষতার ওপর ফের একবার বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন ঝুলিয়ে দিয়েছে।

নির্মমতার সেই অভিশপ্ত রাত

গত শনিবার রাতে যখন গোটা গ্রাম গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখনই লাঠি, টাঙি এবং দেশি পিস্তল নিয়ে একদল দুষ্কৃতী হানা দেয় রামবচন মাহাতোর বাড়িতে। স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা সংখ্যায় ছিল অন্তত ১০ থেকে ১২ জন। তারা বাড়ির সদর দরজা ভেঙে ভিতরে ঢোকেই নির্বিচারে আক্রমণ শুরু করে। ৬০ বছর বয়সী রামবচন বাবু এবং তার স্ত্রী কৌশল্যা দেবীকে প্রথমে পিটিয়ে জখম করা হয়। তাদের আর্তনাদ শুনে যখন বড় ছেলে এবং তার স্ত্রী বাঁচাতে আসেন, তখন তাদের ওপর চলে ধারালো অস্ত্রের কোপ। এমনকি অপরাধীদের হাত থেকে রেহাই পায়নি ওই পরিবারের ১০ বছরের এক শিশুও।

ভোরবেলা প্রতিবেশীরা রক্তাক্ত ঘরবাড়ি দেখে পুলিশে খবর দিলে বৈশালি থানার পুলিশ এসে পাঁচটি নিথর দেহ উদ্ধার করে। প্রাথমিক ময়নাতদন্তের রিপোর্ট বলছে, প্রত্যেকেরই মৃত্যু হয়েছে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং মাথায় গুরুতর আঘাতের ফলে। এই পৈশাচিকতা প্রমাণ করে যে অপরাধীরা কেবল খুনের উদ্দেশ্যে আসেনি, বরং চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করতে চেয়েছিল।

অপরাধের নেপথ্যে: জমি ও গ্রামীণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব

তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পেরেছে, রামবচন মাহাতোর সাথে তার পৈতৃক জমির এক বিঘা জমি নিয়ে স্থানীয় এক প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দীর্ঘ ২০ বছর ধরে মামলা চলছিল। গত মাসেই আদালত রামবচন বাবুর পক্ষে রায় দেয়। গ্রামবাসীদের অভিযোগ, এই রায়ের পরেই ওই প্রভাবশালী গোষ্ঠী প্রকাশ্য দিবালোকে রামবচন বাবুকে খুনের হুমকি দিয়েছিল।

বিহারে জমি সংক্রান্ত অপরাধ কোনো নতুন বিষয় নয়। জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরোর (NCRB) তথ্য অনুসারে, বিহারে প্রতি বছর ঘটা খুনের ঘটনার প্রায় ৬০ শতাংশেরই মূল কারণ জমি বিবাদ। জমি সংস্কারের অভাব এবং আইনি দীর্ঘসূত্রতা সাধারণ মানুষকে আইন হাতে তুলে নিতে প্ররোচিত করছে।

বিহারের আইন-শৃঙ্খলা: চ্যালেঞ্জের মুখে প্রশাসন

এই ঘটনার পর থেকেই বৈশালি উত্তপ্ত। উত্তেজিত জনতা পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তুলে রাস্তা অবরোধ করে এবং টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ দেখায়। মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার এই ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে উচ্চপর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে বিরোধী দলগুলোর দাবি, বিহারে এখন ‘জঙ্গলরাজ’ ফিরে এসেছে।

পুলিশ ইতিমধ্যেই পাঁচজনকে আটক করেছে, যার মধ্যে ওই প্রভাবশালী পরিবারের দুই সদস্য রয়েছে। তবে মূল অভিযুক্ত, যে এই চক্রের পাণ্ডা বলে পরিচিত, সে এখনও পলাতক। পুলিশের আইজি জানিয়েছেন, “আমরা বিশেষ টাস্ক ফোর্স (STF) গঠন করেছি এবং আশা করছি খুব দ্রুত মূল আসামিদের গ্রেপ্তার করা হবে।”

ভুক্তভোগী পরিবারের হাহাকার

রামবচন মাহাতোর ছোট ছেলে, যে ঘটনার সময় কাজের সূত্রে পাটনায় ছিল, সে এখন নিঃস্ব। সে কাঁদতে কাঁদতে জানায়, “পুলিশকে আমরা বারবার হুমকির কথা জানিয়েছিলাম, কিন্তু তারা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। আজ আমার গোটা পরিবার শেষ হয়ে গেল কেবল এক টুকরো মাটির জন্য। আমি কার কাছে বিচার চাইব?” এই প্রশ্নটি আজ কেবল বৈশালির নয়, বরং বিহারের প্রতিটি সাধারণ মানুষের মনের কথা।

বিহারে অপরাধের বর্তমান গতিপ্রকৃতি (সারণী)

অপরাধের ধরনবৃদ্ধির হার (২০২৫-২৬)মূল কারণ
জমি বিবাদ সংক্রান্ত খুন১২% বৃদ্ধিমামলার দীর্ঘসূত্রতা ও দখলদারি
অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার৮% বৃদ্ধিসহজলভ্যতা ও রাজনৈতিক প্রশ্রয়
রাজনৈতিক সহিংসতা৫% বৃদ্ধিপঞ্চায়েত ও স্থানীয় দাপট

সমাজতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট: কেন থামছে না এই রক্তপাত?

মনোবিদ ও সমাজতাত্ত্বিকদের মতে, বিহারের গ্রামীন সমাজে শক্তির আস্ফালন এক বড় সমস্যা। “যার লাঠি তার মাটি” (Jiski Lathi, Uske Bhains)—এই প্রবাদটি আজও গ্রামীণ বিহারে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এছাড়া শিক্ষার অভাব এবং বেকারত্ব যুবসমাজকে খুব সহজেই অপরাধ জগতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সস্তায় দেশি পিস্তল বা ‘কাট্টা’ পাওয়া যাওয়ায় তুচ্ছ কারণেও খুনের ঘটনা ঘটছে।

পরবর্তী পদক্ষেপ ও পুলিশের আশ্বাস

প্রশাসনের তরফে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটিকে সরকারি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা করা হয়েছে। তবে গ্রামবাসীদের দাবি, কেবল টাকা নয়, দোষীদের ফাঁসি চাই। বৈশালির পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, তারা ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্টে এই মামলার বিচার চাইবেন যাতে দ্রুত সাজা নিশ্চিত করা যায়।

সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে যাতে অপরাধীরা ভিনরাজ্যে পালিয়ে যেতে না পারে। ফরেনসিক দল ঘটনাস্থল থেকে গুরুত্বপূর্ণ আঙুলের ছাপ ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করেছে, যা আদালতে প্রমাণ হিসেবে পেশ করা হবে।

উপসংহার:

বৈশালির এই গণহত্যা বিহারের সমাজ ও রাজনীতির এক অন্ধকার দিককে উন্মোচিত করেছে। একটি গণতান্ত্রিক দেশে আদালতের রায় পাওয়ার পরও যদি সাধারণ মানুষকে সপরিবারে প্রাণ দিতে হয়, তবে বিচার ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা তলানিতে গিয়ে ঠেকে। বিহার সরকারকে কেবল ‘সুশাসন’-এর স্লোগান দিলেই চলবে না, বরং মাঠ পর্যায়ে পুলিশি ব্যবস্থা ও জমি সংক্রান্ত আইনি সংস্কারে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। নচেৎ, রামবচন মাহাতোর মতো আরও বহু পরিবারকে এভাবে অকালে বলি হতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *