দীর্ঘ ছয় মাস প্রতীক্ষার পর অবশেষে বাঁকুড়া জেলা আদালতে পেশ করা হলো শালতোড়ার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সমরেশ মণ্ডলের অপহরণ ও খুনের মামলার চার্জশিট। জেলা পুলিশের অপরাধ দমন শাখা (Crime Branch) এবং গোয়েন্দা বিভাগের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তৈরি এই ৮০০ পাতার নথিতে খুনের মোটিভ, অপরাধের ধরন এবং আট জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অকাট্য প্রমাণ দাখিল করা হয়েছে। ঘটনার পৈশাচিকতা এবং তদন্তের গভীরে গিয়ে পুলিশ যেভাবে অপরাধের জট ছাড়িয়েছে, তা জেলাবাসীর কাছে এক দৃষ্টান্ত হয়ে রইল।
ঘটনার প্রেক্ষাপট: এক নিস্তব্ধ রাতের নিখোঁজ সংবাদ
২০২৫ সালের জুলাই মাসে বাঁকুড়ার শালতোড়া থানা এলাকায় নিজের বাড়ি থেকে নিখোঁজ হন হার্ডওয়্যার ব্যবসায়ী সমরেশ মণ্ডল। নিখোঁজ হওয়ার ঠিক তিন দিন পর দামোদর নদের তীরের একটি ঝোপঝাড়ের আড়ালে তার হাত-পা বাঁধা এবং গলিত দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। উদ্ধার হওয়া দেহের নৃশংসতা দেখে শিউরে উঠেছিল গোটা জেলা। সেই সময় থেকেই উত্তাল ছিল বাঁকুড়া। পুলিশের ওপর চাপ ছিল দ্রুত তদন্ত শেষ করে দোষীদের চিহ্নিত করার।
চার্জশিটের মূল নির্যাস: নেপথ্যে ছিল কারা?
পুলিশের পেশ করা এই চার্জশিটে প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে সমরেশ বাবুরই এক দূর সম্পর্কের আত্মীয় এবং ব্যবসায়িক অংশীদার বিকাশ মণ্ডলকে। তদন্তকারীদের দাবি, বিকাশ দীর্ঘদিনের পাওনা টাকা এবং নতুন একটি জমির ডিল নিয়ে সমরেশ বাবুর ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে, বিকাশ একাই এই কাজ করেনি; সে ঝাড়খণ্ডের পুরুলিয়া সীমান্ত এলাকা থেকে তিন জন ভাড়াটে খুনি বা সুপারি কিলার নিয়োগ করেছিল।
চার্জশিটে মোট আট জনের নাম রয়েছে। তাদের মধ্যে পাঁচ জন বর্তমানে জেল হেফাজতে এবং বাকি তিন জন এখনও ফেরার। ফেরার আসামিদের বিরুদ্ধে পুলিশ আগেই লুক-আউট নোটিশ জারি করেছিল।
অপরাধের নীল নকশা: যেভাবে খুন করা হয়
চার্জশিটে অপরাধের যে সময়ের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে (Timeline of Crime), তা অত্যন্ত পরিকল্পিত। ঘটনার দিন রাত ৯টা নাগাদ সমরেশ বাবুকে একটি জরুরি আলোচনার কথা বলে বাড়ির পাশের একটি আমবাগানে ডেকে আনা হয়। সেখানে আগে থেকেই ঘাপটি মেরে বসেছিল ঘাতকরা।
তদন্তে জানা গেছে, ক্লোরোফর্ম ব্যবহার করে তাকে প্রথমে অচৈতন্য করা হয়। এরপর একটি ছোট ট্রাকে করে তাকে সীমান্ত পেরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু রাস্তায় পুলিশের নাকা চেকিংয়ের ভয়ে অপরাধীরা গতিপথ পরিবর্তন করে এবং দামোদর নদের নির্জন পাড়ে নিয়ে গিয়ে তাকে শ্বাসরোধ করে খুন করে। খুনের পর পরিচয় গোপন করতে সমরেশ বাবুর মুখে অ্যাসিড ঢেলে দেওয়া হয়েছিল—এই তথ্যের উল্লেখ রয়েছে ফরেনসিক রিপোর্টে, যা চার্জশিটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অকাট্য তথ্যপ্রমাণ: পুলিশের তুরুপের তাস
চার্জশিটে কেবল বয়ান নয়, আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে পাওয়া প্রমাণকেও সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
- ডিজিটাল প্রমাণ: অভিযুক্তদের মোবাইল টাওয়ার লোকেশন ঘটনার রাতে একই জায়গায় ছিল বলে প্রমাণ মিলেছে। এছাড়াও হোয়াটসঅ্যাপে খুনের ষড়যন্ত্র সংক্রান্ত কিছু ডিলিট করা মেসেজ রিট্রিভ করেছে সাইবার সেল।
- ফরেনসিক ও ডিএনএ: ঝোপ থেকে উদ্ধার হওয়া রক্তের দাগ এবং অভিযুক্তদের কাপড়ে লেগে থাকা কাদার নমুনা মিলে গিয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে ‘শ্বাসরোধ’ (Manual Strangulation) করে খুনের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
- সাক্ষী: চার্জশিটে মোট ৪৫ জন সাক্ষীর বয়ান রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে ঘটনার দিন আমবাগানের পাশ দিয়ে যাওয়া এক গ্রামবাসীর গোপন জবানবন্দি (১৬৪ ধারা) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
বাঁকুড়া জেলা পুলিশের বক্তব্য ও পরবর্তী পদক্ষেপ
বাঁকুড়ার পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, “আমরা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে চার্জশিটটি তৈরি করেছি যাতে কোনো ফাঁক না থাকে। অপরাধীদের সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য। এই ৮০০ পাতার নথিতে প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।”
চার্জশিট পেশ করার পর এখন বিচার প্রক্রিয়া (Trial) শুরু হওয়ার অপেক্ষা। পুলিশের দাবি, যেভাবে তারা তথ্যপ্রমাণ সাজিয়েছে তাতে আসামিদের যাবজ্জীবন বা মৃত্যুদণ্ড হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
উপসংহার: শালতোড়ার এই ঘটনা প্রমাণ করে যে অনেক সময় পরিচিত মানুষই সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। বাঁকুড়ার এই ব্যবসায়ীর মৃত্যু কেবল একটি পরিবারকে ধ্বংস করেনি, বরং গোটা জেলার নিরাপত্তা বোধে নাড়া দিয়েছিল। পুলিশের এই দ্রুত এবং সুশৃঙ্খল চার্জশিট পেশ সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। এখন দেখার, আদালতের এজলাসে বিচারক এই পৈশাচিক অপরাধের কী রায় দেন।