তিলোত্তমা কলকাতায় ফের এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী থাকল শহরবাসী। দক্ষিণ কলকাতার নিউ গড়িয়া এলাকার একটি অভিজাত আবাসনে সাতসকালে উদ্ধার হলো সত্তর বছর বয়সী এক বৃদ্ধার রক্তাত্ব দেহ। মৃতার নাম বিজয়া দাস। এই ঘটনা কেবল ওই আবাসনের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি, বরং খাস কলকাতায় প্রবীণ নাগরিকদের সুরক্ষা ব্যবস্থার কঙ্কালসার চেহারাটাকেও ফের একবার সামনে নিয়ে এসেছে। তদন্তে নেমে লালবাজারের গোয়েন্দারা কেবল কলকাতার অলিগলি নয়, বরং তাদের নজর এখন উত্তর ২৪ পরগনার এক কুখ্যাত অপরাধী চক্রের দিকে।
রবিবার সকালে প্রতিদিনের মতো কাজে এসেছিলেন বাড়ির পরিচারিকা। কলিং বেল বাজিয়েও ভিতর থেকে কোনো সাড়া না পাওয়ায় তিনি পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের খবর দেন। সন্দেহ হওয়ায় প্রতিবেশীরা এসে দেখেন সদর দরজাটি বাইরে থেকে বন্ধ, কিন্তু তালা ঝোলানো নেই। দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই দেখা যায় ড্রয়িং রুমের মেঝের ওপর হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছেন বিজয়া দেবী। তার মুখ চওড়া সেলোটেপ দিয়ে আটকানো ছিল এবং গলায় ধারালো অস্ত্রের গভীর আঘাত ছিল স্পষ্ট। বাড়ির বৃদ্ধ কর্তা পিকে দাসকে অচৈতন্য অবস্থায় পাশের ঘরের খাটের নিচে পড়ে থাকতে দেখা যায়। তাকে দ্রুত উদ্ধার করে ই এম বাইপাস সংলগ্ন একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, তবে তার অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।
ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই ঘটনাস্থলে পৌঁছান কলকাতা পুলিশের কমিশনার এবং গোয়েন্দা বিভাগের ঊর্ধ্বতন আধিকারিকরা। স্নিফার ডগ এবং ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরাও সংগৃহীত তথ্য খতিয়ে দেখতে শুরু করেন। আবাসনের সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে পুলিশ জানতে পেরেছে যে শনিবার গভীর রাতে একটি কালো রঙের মোটরবাইকে করে দুই যুবক আবাসনের পিছন দিকের দেওয়াল টপকে ভিতরে ঢোকে। তদন্তকারীদের দাবি, বাইকের নম্বর প্লেটটি কাদা দিয়ে লেপা ছিল যাতে সহজে চেনা না যায়। তবে পুলিশের সাইবার সেল টাওয়ার লোকেশন বিশ্লেষণ করে দেখেছে যে খুনের ঠিক পরেই অপরাধীদের মোবাইল সিগন্যাল উত্তর ২৪ পরগনার শাসন এবং বারাসাত এলাকায় সক্রিয় ছিল।
এই খুনের নেপথ্যে কেবল টাকা বা গয়না লুঠের উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে গোয়েন্দাদের মনে। যদিও আলমারি তছনছ করা হয়েছে এবং কিছু গয়না গায়েব হয়েছে, কিন্তু যেভাবে বৃদ্ধাকে ‘টার্গেট’ করা হয়েছে তাতে ঠান্ডা মাথার সুপারি কিলারের হাতের ছাপ দেখছেন গোয়েন্দারা। সূত্র মারফত জানা যাচ্ছে, মৃত বিজয়া দেবীর পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট মহকুমার একটি প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিবাদ চলছিল। কিছুদিন আগে একটি জমি সংক্রান্ত মামলায় বিজয়া দেবী আইনি জয় পেয়েছিলেন। পুলিশের ধারণা, সেই আক্রোশ থেকেই হয়তো ভাড়াটে খুনি লাগিয়ে এই কাজ হাসিল করা হয়েছে।
ইতিমধ্যেই উত্তর ২৪ পরগনার শাসন ও সংলগ্ন গ্রামগুলিতে তল্লাশি চালিয়ে তিন যুবককে আটক করেছে পুলিশ। তাদের জেরা করে গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন যে ওই এলাকার এক কুখ্যাত সমাজবিরোধী এই খুনের পরিকল্পনা করেছিল এবং অপারেশনের জন্য প্রায় দুই লক্ষ টাকা সুপারি দেওয়া হয়েছিল। তবে খুনের সময় ওই মূল অভিযুক্ত নিজে ঘটনাস্থলে ছিল না বলেই অনুমান করা হচ্ছে। গোয়েন্দাদের একটি দল বর্তমানে বসিরহাট সীমান্তে ডেরা গেড়েছে, কারণ অপরাধীদের সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়ার একটা বড় সম্ভাবনা রয়েছে।
কলকাতার বুকে এই ধরণের ঘটনা নতুন নয়। গত কয়েক বছরে প্রবীণ নাগরিকদের নিশানা করে খুনের প্রবণতা অনেকটাই বেড়েছে। নিউ গড়িয়ার এই আবাসনে কোনো স্থায়ী সিকিউরিটি গার্ড ছিল না, যার সুযোগ নিয়েছে অপরাধীরা। লালবাজারের এক গোয়েন্দা আধিকারিক জানিয়েছেন যে আবাসনের একাংশে সিসিটিভি কাজ না করা এবং বাইরের লোকেদের নাম নথিভুক্ত না করার ফলেই এই বিপদ ত্বরান্বিত হয়েছে।
বর্তমানে কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী জেলার পুলিশ সমন্বয় করে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ধৃতদের জেরা করে মূল অভিযুক্তের ডেরার খোঁজ পাওয়ার চেষ্টা চলছে। হাসপাতাল সূত্রে খবর, বৃদ্ধ পিকে দাসের জ্ঞান ফিরলে তার জবানবন্দি এই মামলার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। তিলোত্তমার এই নিঃস্তব্ধ পাড়ায় এখন কেবলই পুলিশের টহলদারি আর বাসিন্দাদের চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ। নিরাপত্তার যে চাদরে মোড়া থাকার দাবি প্রশাসন করে, সেই চাদর ছিঁড়ে ঘাতকের ছুরি যেভাবে এক বৃদ্ধার প্রাণ কেড়ে নিল, তা শহরবাসীর আত্মবিশ্বাসে বড়সড় আঘাত করেছে।