হোম / গ্রেপ্তার / মধ্যমগ্রামে পুলিশের মেগা অপারেশন: কোটি টাকার সোনা-সহ গ্রেপ্তার আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের ৩ পাণ্ডা

মধ্যমগ্রামে পুলিশের মেগা অপারেশন: কোটি টাকার সোনা-সহ গ্রেপ্তার আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের ৩ পাণ্ডা

মধ্যমগ্রামে পুলিশের বড়সড় সাফল্য। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে হানা দিয়ে কয়েক কোটি টাকার সোনা-সহ গ্রেপ্তার করা হলো আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের ৩ পাণ্ডাকে। দুবাই থেকে কলকাতা হয়ে এই সোনা কোথায় যাচ্ছিল, তা নিয়ে তদন্তে নেমেছে সিআইডি। ২০২৬ সালের এই বিশেষ প্রতিবেদনে দেখুন কীভাবে কাজ করত এই চক্র।

নতুন বছরের শুরুতেই উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রাম এলাকায় বড়সড় সাফল্যের মুখ দেখল রাজ্য পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (STF) এবং মধ্যমগ্রাম থানার পুলিশ। রবিবার গভীর রাতে মধ্যমগ্রামের বাদু রোড সংলগ্ন একটি জনবহুল এলাকায় হানা দিয়ে কয়েক কোটি টাকার সোনার বাট-সহ একটি আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের তিন মূল পাণ্ডাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোটা জেলায় শোরগোল পড়ে গিয়েছে। ধৃতদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ সোনার পাশাপাশি নগদ টাকা এবং বেশ কিছু ভুয়া পরিচয়পত্র উদ্ধার করা হয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, গত কয়েক মাস ধরেই গোয়েন্দাদের কাছে খবর ছিল যে সোনা পাচারের একটি বড় নেটওয়ার্ক মধ্যমগ্রাম এবং বারাসাত অঞ্চলকে তাদের করিডোর হিসেবে ব্যবহার করছে। এই চক্রটি মূলত দুবাই থেকে সোনা সংগ্রহ করে জলপথে বাংলাদেশে নিয়ে আসত। এরপর সীমান্ত সংলগ্ন এলাকা দিয়ে সেই সোনা চোরাপথে ভারতে প্রবেশ করানো হতো। মধ্যমগ্রামকে তারা ‘সেফ হাউস’ হিসেবে বেছে নিয়েছিল কারণ এখান থেকে সড়ক ও রেলপথে কলকাতার বিভিন্ন প্রান্ত এবং উত্তর ভারতে সোনা ছড়িয়ে দেওয়া সহজ ছিল।

রবিবার রাত একটা নাগাদ গোপন সূত্রে প্রাপ্ত খবরের ভিত্তিতে বারাসাত পুলিশ জেলার উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের নেতৃত্বে একটি বিশাল পুলিশ বাহিনী বাদু রোডের একটি তিনতলা বাড়িতে ঘেরাও করে। পুলিশ দেখে পালানোর চেষ্টা করলেও শেষরক্ষা হয়নি। গ্রেপ্তার করা হয় মহম্মদ কাসেম, রতন বিশ্বাস এবং পাঞ্জাবের বাসিন্দা হরপ্রীত সিংকে। হরপ্রীত সিং মূলত লজিস্টিকস সামলাত এবং উত্তর ভারতে এই সোনা পাঠানোর জন্য বিশেষ ধরনের গাড়ি ও ট্রাকের ব্যবস্থা করত। ওই বাড়ির একটি গোপন কুঠুরি থেকে তল্লাশি চালিয়ে প্রায় ১২ কেজি সোনার বাট উদ্ধার হয়েছে, যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ৮ কোটি টাকারও বেশি।

তদন্তকারীদের দাবি, এই চক্রটি অত্যন্ত পেশাদার ঢঙে কাজ করত। তারা সোনা পরিবহনের জন্য এমন কিছু গাড়ি ব্যবহার করত যেগুলোর সিটের নিচে বা ইঞ্জিনের ভেতর বিশেষ গোপন চেম্বার তৈরি করা ছিল। সাধারণ চেকিংয়ে এগুলো ধরা পড়া প্রায় অসম্ভব ছিল। তবে গোয়েন্দারা প্রযুক্তির ব্যবহার করে কয়েক সপ্তাহ ধরে তাদের গতিবিধি ট্র্যাক করছিলেন। ধৃতদের জেরা করে জানা গিয়েছে, এই সোনার ব্যবসার লভ্যাংশ হাওয়ালা কারবারের মাধ্যমে ভিনরাজ্যে পাঠানো হতো এবং এর আড়ালে বড় কোনো অর্থনৈতিক অপরাধের ছক ছিল কি না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

মধ্যমগ্রামের মতো একটি শান্ত এবং জনবহুল এলাকায় কীভাবে এত বড় একটি পাচার চক্র ডেরা বাঁধল, তা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বাড়ি ভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময় মালিকরা উদাসীনতা দেখান এবং সঠিক পুলিশ ভেরিফিকেশন করেন না। পুলিশ ইতিমধ্যেই ওই বাড়ির মালিককে তলব করেছে এবং এলাকার অন্যান্য ভাড়াবাড়ি ও লজগুলোতে তল্লাশি চালানোর নির্দেশ দিয়েছে।

ধৃত তিনজনকে সোমবার বারাসাত আদালতে পেশ করা হলে বিচারক তাদের ১৪ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন। পুলিশের ধারণা, এই চক্রের শিকড় আরও গভীরে এবং এর সাথে বিমানবন্দরের কোনো কর্মী বা প্রভাবশালী কোনো মহলের যোগসূত্র থাকলেও থাকতে পারে। এই বিশাল গ্রেপ্তারের পর উত্তর ২৪ পরগনার সীমান্ত সংলগ্ন প্রতিটি থানায় নাকা চেকিং এবং নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। পাচারকারীদের মাস্টারমাইন্ডদের হদিস পেতে সিআইডিও (CID) তদন্তে নামার ইঙ্গিত দিয়েছে।

মধ্যমগ্রামের এই সফল অপারেশন কেবল একটি বড় পাচার চক্রকে রুখে দেয়নি, বরং শহরতলির নিরাপত্তায় পুলিশের তৎপরতাকেও প্রমাণ করেছে। তবে সাধারণ মানুষের মতে, এই ধরণের আন্তঃরাজ্য অপরাধ রুখতে হলে পাড়ার প্রতিটি মোড়ে সিসিটিভি ক্যামেরা বাড়ানো এবং সন্দেহজনক গতিবিধি দেখলেই পুলিশকে জানানো জরুরি। ২০২৬ সালের এই প্রথম বড় সাফল্য পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের মনোবলকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *